কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষে পিছিয়ে পরা অনগ্রসর জেলা কুড়িগ্রামের উলিপুর, চিলমারী, রাজারহাট ও নাগেশ্বরীতে প্রায় চব্বিশ কোটি টাকা ব্যয়ে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী বগুড়ার উদ্যোগে নির্মিত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণ চারটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন- বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর পরিচালক মো: খালিদ আওরংগজেব। কেন্দ্রগুলোতে ছোট-বড় ১২ টি রুমে ছোট আকারে ধান ভাঙ্গানো, গম ভাঙ্গানো, সরিষা/সূর্যমুখী/তিল ভাঙ্গানো মেশিন রয়েছে। নির্মাণের ৪ বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রগুলো অব্যবহৃত থাকায় ভেতরে থাকা কোটি কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে জানাগেছে। চালু হতে আরও কতদিন লাগবে তার সঠিক দিনক্ষণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে কবে কিংবা আদৌ চালু হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন স্থানীয়রা। ফলে প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী রংপুর এর পরিচালক (উপসচিব), প্রশিক্ষণ ও অর্থ মো: জাহেদুল হক চৌধুরী শুনিয়েছেন আশার বাণী।
বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের আওতায় বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) ২০১৮ সালে জেলার চারটি উপজেলায় এ ধরনের কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় জেলার উলিপুর, চিলমারী, রাজারহাট ও নাগেশ্বরী উপজেলায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ হয়। জমি ক্রয় ও ভবন নির্মাণসহ এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৪ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনে প্রয়োজনীয় উৎপাদনমুখী মেশিনপত্র স্থাপন করে বগুড়া আরডিএর কাছে হস্তান্তর করে। এরপর বগুড়া আরডিএ অফিস রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর কাছে হস্তান্তর করে। তখন থেকে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী রংপুরের তত্বাবধানেই রয়েছে এগুলো।
তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে কেন্দ্রগুলো তালাবদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে শুধু গেটম্যান দুটি ছোট কক্ষে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া দুইজন করে পাহারাদার অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মূল ফটকে ঝুলছে অনেক বড় তালা। ভেতরে চুক্তিভিত্তিক পাহারাদার রয়েছেন ২জন করে। তাদের মধ্যে রোকন মিয়া ও মশিউর দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, পাহারা দেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ বা তথ্য জানা নেই।
আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যেন এখান থেকে সব ধরনের সুবিধা পান, সেভাবে এটি সাজানো হয়েছে। কেন্দ্র চালু হলে একজন উদ্যোক্তার মাধ্যমেই অন্তত ২০/২৫ জনের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কেন্দ্রগুলো লিজ দেওয়ার জন্য রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে ১৪ সদস্যের একটি জেলা উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কমিটিতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ, প্রাণিসম্পদ, সমবায় ও বিআরডিবিসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা রয়েছেন। সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সমবায়ভিত্তিক সমিতি, এনজিও বা আগ্রহী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে লিজ দেওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, উলিপুর, চিলমারীসহ কুড়িগ্রাম জেলা একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এই কেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু হলে প্রান্তিক কৃষক থেকে শুরু করে কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন এবং উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পাবেন।
পল্লী উন্নয়ন একাডেমি রংপুর’র পরিচালক (উপসচিব) প্রশিক্ষণ ও অর্থ মো: জাহেদুল হক চৌধুরী বলেছেন, প্রতিটি কেন্দ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাঝে খুব শীঘ্রই লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। উক্ত স্থানে ছোট-বড় ১২ টি রুমে ছোট আকারে ধান ভাঙ্গানো, গম ভাঙ্গানো, সরিষা/সূর্যমুখী/তিল ভাঙ্গানো মেশিন রয়েছে। বেকারী পন্য তৈরীর লাইন, চিপস তৈরীর মেশিন, টমেটো সস, আম/আনারসের পাল্প/ জুস তৈরীর মেশিন, ক্যান্ডি তৈরীর মেশিন, মসলা প্রসেস ও গুড়া করা মেশিন, দৈ তৈরীর ইনকুবেটর সহ যাবতীয় যন্ত্রপাতি, চিপস, সস, তরল, পাউডার জাতীয় পন্যের প্যাকিং মেশিন, ৩টি কোল্ডরুম (দুইটি সবজি বা ফলের জন্য একটি মাছ/ গোস্তের জন্য) সহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, পন্যের গুণগতমাণ পরীক্ষার যন্ত্রপাতি আছে। এছাড়া বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন, সোলার সহ উঁচু প্রাচীর ঘেরা ও সিসি ক্যামেরা দিয়ে পর্যবেক্ষণের সুবিধা আছে। প্রতিটি স্থাপনা ৫০ শতকের উপর নির্মিত।
এখানে উল্লেখ্য যে, কুড়িগ্রাম জেলায় সরাসরি কোনো পল্লী উন্নয়ন একাডেমি নেই, তবে কুড়িগ্রামসহ রংপুর অঞ্চলের পল্লী উন্নয়নে কাজ করার জন্য রংপুরের তারাগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, রংপুর। এছাড়া কুড়িগ্রাম জেলায় স্থানীয় পর্যায়ে পল্লী উন্নয়ন ও সেবা পরিচালনার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি), কুড়িগ্রাম। যার মাধ্যমে কুড়িগ্রাম ও জামালপুরসহ আশেপাশের জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলায় সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করছে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, কুড়িগ্রাম সদর অফিস।
পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), রংপুর দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, গবেষণা এবং টেকসই পল্লী উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষায়িত স্বায়ত্তশাসিত প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীন পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার জনগণের উন্নয়ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আরডিএ, বগুড়া কর্তৃক বাস্তবায়িত “পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, রংপুর স্থাপন (১ম সংশোধিত)” প্রকল্পের আওতায় সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে একাডেমির অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে “পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, রংপুর আইন, ২০২৩” এবং এর সংশোধিত আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ আইনগত ভিত্তি লাভ করে।
রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী, কাচনা ও জগদীশপুর মৌজায় প্রায় ৫০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমিতে আধুনিক প্রশাসনিক ভবন, প্রশিক্ষণ ভবন, গেস্ট হাউস, ক্যাফেটেরিয়া, সাধারণ হোস্টেল, মেডিকেল সেন্টার, মসজিদ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন এবং কৃষি প্রদর্শনী খামারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
একাডেমির প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে পল্লী উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান, গবেষণা ও প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনা, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, পরামর্শ সেবা প্রদান, নীতি সহায়তা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার-কর্মশালার আয়োজন এবং উন্নয়নমূলক প্রকাশনা প্রকাশ।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আরও বাস্তবমুখী করতে একাডেমি ক্যাম্পাসে কৃষি যন্ত্রপাতি, ফসল, ডেইরি, পোল্ট্রি, মৎস্য, উদ্যান ও নার্সারি, টিস্যু কালচার এবং হাইড্রোপনিক ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি কুড়িগ্রাম জেলার চারটি উপজেলায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ (এপিএম) কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে একাডেমিতে নিজস্ব ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় অফিস ব্যবস্থাপনা, হাউসকিপিং, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষক দলনেতা উন্নয়ন, কৃষি যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ২,৮০০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ, মৎস্য উন্নয়ন, জাতীয় দিবস পালন এবং সামাজিক সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে।
বর্তমানে খায়রুল আনাম (যুগ্মসচিব) মহাপরিচালক হিসেবে একাডেমির সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর পল্লী উন্নয়নের মাধ্যমে সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, রংপুর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।